কৈফিয়ৎ

সবার প্রথমে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ঘোষণাটি শুরু করতে চাই। এই ওয়েবসাইটের বইগুলোর, বিশেষ করে বাংলা বইগুলোর একটা বড় অংশ সংগ্রহ করা হয়েছে ইন্টারনেটে বিভিন্ন বাংলা ইবুকের সাইট থেকে। বিশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি ফেসবুক গ্রুপ Book Lovers Polapan, amarboi.com, banglainternet.com, মুক্তচিন্তার লাইব্রেরী এর প্রতি। তাদের কাছ থেকে সংগৃহীত বইগুলো grontho.com এ প্রকাশ করার সময় তাদের অনুমতিও নেওয়া হয়নি। অন্যান্য ওয়েবসাইটগুলোও মূলত জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিতে এবং সকলের হাতে সহজে, বিনামূল্যে এবং কিছু ক্ষেত্রে সুলভে বই পৌঁছে দেওয়ার জন্যই এই ধরণের সেবামূলক সাইট চালিয়ে যাচ্ছে, এবং, তারা বাংলা বইগুলোর ইলেকট্রনিক সংস্করণ করে এগুলো সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তাদের মত একই উদ্দেশ্য আমরাও ধারণ করি। আমরাও তাদেরই মত মনে করি, সারাদেশের মানুষের কাছে বিনামূল্যে বই ছড়িয়ে যাক, জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে যাক সবখানে এবং বাংলা ভাষার চমৎকার সব বইগুলো সংরক্ষিত হোক ইন্টারনেটে। আমরা চাই, পৃথিবীর সকল জ্ঞান সকলের জন্য উন্মুক্ত হোক। তাই, অন্যান্য সাইটগুলোর সাথে আমাদের উদ্দেশ্যের কোনো বিরোধ নাই। আমরা সকলেই যেহেতু একই উদ্দেশ্যে কাজ করছি তাই, অন্যান্য সাইটের আপলোড করা বইগুলোকে বিনামূল্যে পাঠকদের কাছে পৌঁছে দিতে তাদের অনুমতি ব্যতিরেকেই তাদের বইগুলোও আমাদের সাইটে প্রকাশ করেছি। আমরা তাদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও অবদানকে পুরোপুরিভাবে সম্মান ও সমর্থন করছি। অন্যসাইট থেকে পাওয়া বইগুলো মূলত তাদের প্রকাশনা – এইটুকু বলে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতাও জ্ঞাপন করছি। আর, তাদের অনুমতি ছাড়াই, শুধুমাত্র একইরকম উদ্দেশ্য হওয়ার জোড়ে একপ্রকার স্নেহসুলভ আবদারেই অনুমতি ছাড়াই তাদের বইগুলো প্রকাশ করছি। আমরা আশা করি, আমাদের এই উদ্যোগ তারা প্রশ্রয়সূচক দৃষ্টিতেই দেখবেন। এরপরেও যদি তাদের একান্তই আপত্তি থাকে আমরা তাহলে তাদের স্ক্যানকৃত বইগুলোকেও প্রত্যাহার করব।

যদিও বইয়ের একটা বাজারমূল্য আছে এবং বই স্ক্যান করে বিনামূল্যে বিতরণ করলে বই প্রকাশক, লেখক ও বিক্রতাগণ অসুবিধার সম্মুখীন হন, তবুও, আমরা বিশ্বাস করি, জ্ঞানকে যতটা উন্মুক্ত করে দেওয়া যায়, সকলের জন্য ততোই মঙ্গল। বই স্ক্যান করলেও আমরা মনে করি, এতে বইয়ের লেখক-প্রকাশকেরা খুব বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হবেন না। কারণ, বই সংগ্রহে রাখাটা মানুষের একটি অতি পুরাতন চর্চা। এটা রুচিবোধেরও ব্যাপার। যারা বই সংগ্রহে রাখবেন তারা স্ক্যান করা বইয়ের জন্য অপেক্ষা করবেন না। মাঝখান থেকে স্ক্যান করলে হয়তো যাদের বই পড়ার অভ্যাস নাই তারাও বই পড়তে কিছুটা উৎসাহী হবেন। তথাপি, এই সাইটে বাংলাদেশী লেখকদের বই আপলোডের বেলায় লেখকদের অনুমতি নেওয়া হয়ে থাকে। তাছাড়া, বাংলাদেশের যেসব লেখকদের বই প্রকাশের ব্যাপারে অনুমতি নেওয়া সম্ভব হয় না সেসব বই কেবলমাত্র “অনলাইন রিডিং” এর জন্য উন্মুক্ত করা হয়, অর্থ্যাৎ, এই বইগুলো কেবলমাত্র পড়া যাবে, শেয়ার করা যাবে না। সুতরাং, লেখকের কপিরাইটকে ক্ষতিগ্রস্থ না করে কেবলমাত্র পড়ার জন্যই আমরা বই প্রকাশ করি। আমাদের সাইটে কোনো বিজ্ঞাপণ প্রচার করা হয় না। এটি একটি সম্পুর্ন অলাভজনক প্রতিষ্ঠান, উপরন্তু, এই সাইটের সমস্ত ব্যয়ভার আমরা নিজেরাই বহন করি এবং পাশাপাশি কেউ অর্থ ডোনেট করতে চাইলে তা গ্রহণ করি।

পাঠ্যবইগুলোর চাহিদা কেবলমাত্র স্ক্যান করে মেটানো সম্ভব নয় বলেই আমরা মনে করি। কারণ, পাঠ্যবইয়ের বিকল্প ইলেকট্রনিক বই হতে পারে না। সত্যিকার বইগুলোই আমাদের পড়াশোনার জন্য সবসময় প্রয়োজন। কিন্তু, কখনো এমন অবস্থা আসতে পারে যখন কোনো বিশেষ একটা পাঠ্যবইয়ের বিশেষ অংশটুকুই প্রয়োজন। এমন সময় এই ইলেকট্রনিক পাঠ্যবইগুলো উপকারে আসতে পারে। হরেক রকমের পাঠ্যবই থেকে প্রয়োজনীয় অংশটুকু সচরাচর আমরা ফটোকপিই করে থাকি। এইরকমই প্রয়োজনের সময় এইসব ই-পাঠ্যবইগুলো সহায়ক হতে পারে।

এরপরেও যদি কোনো প্রকাশক বা লেখকের আপত্তি থাকে, তাহলে আমরা অবশ্যই আপত্তি সাপেক্ষে তার বই সাইট থেকে সরিয়ে ফেলা হবে।

গ্রন্থ.কম  নতুন লেখকদের বই প্রকাশে আগ্রহী। নবীন লেখকেরা চাইলে তাদের বই আমাদের সাইটে উন্মুক্ত করে দিতে পারেন। এজন্য grontho.com@gmail.com এ মেইল করে আপনার বই পাঠিয়ে দিন। সঙ্গে অবশ্যই বইটির কভার ফটোটিও পাঠিয়ে দিবেন।

গ্রন্থ.কম একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। অর্থ্যাৎ, এখানে বই বিক্রি হয় না। বরং, আমরা নিজেরাই, যারা সাইটের সঙ্গে যুক্ত, নিজেদের পকেট থেকে একটা নির্দিষ্ট টাকা মাস গেলে জমা করি। তবে আমরা অর্থ সাহায্যের চেয়ে বই এবং লেখকের অনুমতি প্রাপ্তি সংক্রান্ত সাহায্যই অধিক কামনা করি।

গ্রন্থ ডটকম গেরিলা ওপেন একসেস ম্যানিফেস্টোর সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করছে। গেরিলা ওপেন একসেস ম্যানিফেস্টো’র বঙ্গানুবাদ নিচে সংযুক্ত করে দেওয়া হল।

– গ্রন্থ.কম

 

গেরিলা ওপেন একসেস ম্যানিফেস্টো (Guerrilla Open Access Manifesto)

তথ্য হল এক ধরনের ক্ষমতা। এবং, অন্যান্য সব ক্ষমতার মত একেও কিছু মানুষ কুক্ষিগত করে রাখতে চায়। যুগ যুগ ধরেই বইপত্র আর জার্নালগুলোতে বিশ্বের তাবৎ বৈজ্ঞানিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য লিপিবদ্ধ হয়ে আসছে। সেগুলোর ক্রমবর্ধিত ডিজিটাল সংস্করণও তৈরি হচ্ছে ঠিকই, তবে, সেগুলোকে দুষ্প্রাপ্য করে রেখেছে মুষ্টিমেয় কিছু প্রাইভেট কর্পোরেশন। আপনি পৃথিবীর বিখ্যাত সব বৈজ্ঞানিক কাজের নথিগুলো দেখতে চান? তাহলে আপনাকে Reed Elsevire এর মত প্রকাশনাগুলোর পেছনে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হবে।

কিন্তু এমনও মানুষ আছেন যারা এই পরিস্থিতি পরিবর্তনে সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। গেরিলা ওপেন অ্যাকসেস মুভমেন্ট (Guerrilla Open Access Movement) নামক অকুতোভয় আন্দোলনের প্রস্তাব হল, বিজ্ঞানীরা তাদের কাজের কপিরাইট বুঝে নিয়েই যেন খালাস না হয়ে যান, বরং, তাঁদের কাজ যেন ইন্টারনেটে সকলের জন্য উন্মুক্ত থাকে এই শর্তের দিকেও মনোযোগী হন। কিন্তু, এই দৃশ্যপট যদি রাতারাতি পাল্টেও যায়, যদি আজই এই আন্দোলন সফল হয়ে যায়, তাহলেও এর ফল কেবলমাত্র ভবিষ্যতের জন্যই প্রযোজ্য হবে। এখন পর্যন্ত যে বিপুল পরিমাণ তথ্য প্রাইভেট কর্পোরেশনগুলোর কব্জায় রয়েছে সেগুলো মুক্ত করার দৃশ্যত আর কোনো বৈধ উপায় নেই।

বড় বেশী মূল্য দিতে হচ্ছে আমাদের। সহকর্মীদের কাজ পড়তেও একাডেমিকদেরকে মূল্য পরিশোধ করতে বাধ্য করা কি কোনো কাজের কথা? লাইব্রেরির বিশাল সংগ্রহ স্ক্যান করে সংরক্ষণ করে কেবল গুগলে জড়িতদের জন্যে তা উন্মুক্ত রাখাই বা কেমন কথা? প্রথম বিশ্বের অভিজাত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেই কেবল বিজ্ঞানের সব গুরুত্বপূর্ণ নথির যোগান থাকবে, অথচ তথাকথিত তৃতীয় বিশ্বের বিপুল সংখ্যক মানুষকে এই জ্ঞান থেকে বঞ্চিত করা হবে এটাই বা কেমন কথা?

নিঃসন্দেহে এগুলো অত্যন্ত গর্হিত কাজ, এবং কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু, আইনকানুন সবই তাদের পক্ষে। এইসব কর্পোরেশনগুলোই কপিরাইটের ধারক-বাহক। আর, জ্ঞানের ব্যবসাই তাদের অর্থের বিরাট উৎস। তাই, অনেকেই এর সমস্যার দিকটা বুঝতে পেরেও থমকে যান। ভাবেন, “আমরা আর কিই বা করতে পারি?”

কিন্তু, আমাদের করার আছে অনেককিছু। ইতিমধ্যে তা করছিও। আমরা রুখে দাঁড়াচ্ছি। যেসকল শিক্ষার্থী, গ্রন্থাগারিক, গবেষক এই বিপুল জ্ঞানের রস আস্বাদনের সুযোগ পেয়েছেন, আপনারা সৌভাগ্যবান। জ্ঞানের যে মহাযজ্ঞ থেকে পুরো পৃথিবী বঞ্চিত, আপনারা সেখানেই আমন্ত্রিত। কিন্তু, এই সুযোগ কেবল নিজের জন্য তুলে রাখলে চলবেনা। তথ্যের ভাণ্ডারে অবাধ বিচরণের এই সুযোগ আপনাদেরকে কাজে লাগাতে হবে। এটা আপনারা করতে পারেন পাসওয়ার্ড আদানপ্রদান করে অথবা, বন্ধুদের জন্য ডাউনলোড করে।

এদিকে, বঞ্চিতরাও কিন্তু বসে নেই। প্রকাশকদের দখলে থাকা তথ্য তারা বিভিন্ন কৌশলে উন্মুক্ত করে দিচ্ছেন এবং ছড়িয়ে দিতে কাজ করে যাচ্ছেন। স্বাভাবিকভাবেই, এসব কাজ চালাতে হয় গোপনে। একে আবার আইনের চোখে ‘পাইরেসি’ বা ‘চুরি’ হিসেবে দেখা হয়। জ্ঞানের বিরাট ভাণ্ডার মুক্ত করার ‘অপরাধ’ যেন মানুষ হত্যার সমান। কিন্তু, খুব সাধারণভাবে চিন্তা করলেই আমরা বুঝতে পারব, এটা অনৈতিক কিছু তো নয়ই, বরং যুগ যুগ ধরে অর্জিত জ্ঞানের সংগ্রহ সকলের সাথে ভাগাভাগি করে নেওয়াটাই একান্ত প্রয়োজনীয়। লোভ আমাদের বোধশক্তি গ্রাস করে না ফেললে এই সত্য সকলেরই বুঝতে পারার কথা।

আর, বড় বড় কর্পোরেশনগুলোর চালিকাশক্তিই হল লোভ। যেসব আইন তাদের স্বার্থসিদ্ধি করে, তাতে এক চুল পরিবর্তন হলেই এইসব কর্পোরেশনের অংশীদারেরা বেজার হবেন। আর, রাষ্ট্রের সব রাজনীতিকেরা তো আছেনই তাদের রক্ষাকর্তা হিসাবে। তাই, তাদের প্রণীত আইনকানুনই এসব কর্পোরেশনগুলোকে তাদের স্বার্থ একতরফাভাবে রক্ষা করার সীমাহীন ক্ষমতা দিয়ে থাকে।

অন্যায্য আইন মানার কোনো অর্থই হয় না। তাই, আইন ভাঙার সময় এসেছে। সময় এসেছে স্পষ্ট করে বলবার যে, মানুষের অর্জিত কোনো জ্ঞানকেই কোনো দানব কর্পোরেশন তাদের পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করতে পারবেনা। জ্ঞান হবে উন্মুক্ত। তাই, পৃথিবীর সমস্ত তথ্যে আমাদের সকলের অবাধ বিচরণ থাকবে, বন্ধুদের সাথে ভাগাভাগি করে নেওয়ার অধিকার থাকবে – সেগুলো যেখানেই সংরক্ষিত থাকুক না কেন। কপিরাইট উত্তীর্ণ তথ্যের আর্কাইভ করতে হবে। সকল গোপন ডেটাবেজ, সকল বৈজ্ঞানিক জার্নাল উন্মুক্ত করতে হবে। গেরিলা ওপেন এক্সেসের জন্য আমাদেরকে লড়তে হবে।

পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য সহযোদ্ধাদের নিয়ে আমরা শুধুমাত্র জ্ঞানের বাণিজ্যিকীকরণের বিরুদ্ধে শক্ত একটা বার্তাই পৌঁছে দেব না, আমরা একে অতীতের ভাগাড়ে পাঠিয়ে দেব। আমাদের সঙ্গী হবেন?

 

এরোন সোয়ার্টজ
জুলাই ২০০৮, আরমেয়ো, ইতালি

মূল ইংরেজি সংস্করণটি পড়তে এখানে ক্লিক করুন

Share on FacebookShare on Google+Tweet about this on TwitterShare on StumbleUponPin on PinterestShare on RedditShare on LinkedInShare on TumblrDigg thisEmail this to someone